আরিফুজ্জামান তুহিন
কাউকে ঠকানো কি বাহাদুরি হতে পারে!
১. শ্রম সচিব টিএনজেড গার্মেন্টসের বকেয়ার ১৭ কোটি টাকার বেশি থেকে শ্রমিকদের ৩ কোটি টাকা ঈদের আগের দিনের মধ্যে দেবার বিষয়ে পাক্কা কথা দিলেন। রাত ১০ টা বেজে ২০, সকালে ঈদে বহু শ্রমিকের বিকাশ নম্বরে এখনো ৯ হাজার টাকার সেই টাকাটা আসেনি, আবার কোম্পানির একাউন্টসের লোক মোবাইলও ধরছে না। এবার বলুন, এই মালিকেরা কতবড় ইবলিশ।
বেক্সিমকোর গার্মেন্টস বন্ধ হইছে,গাজির কারখানা পোড়ানো হয়েছে এরকম যেসব কারখানার শ্রমিক আছে তাদের ঈদ কেমন যাবে? তাদের বাচ্চাদের গায়ে একটা সাধারণ জামা কাপড় উঠবে?
২.
মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষ করে প্রতি বিঘায় ৫০-৬০ হাজার টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন কুষ্টিয়ার পেঁয়াজ চাষিরা। (ডেইলি স্টার ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৪)। এই হিসাব মুড়িকাটা পেঁয়াজের। মুড়িকাটা পেঁয়াজ হয় পেঁয়াজের কন্দ থেকে। এ পেঁয়াজ চাষে খরচ খানিকটা বেশি হলেও আগাম জাতের হওয়ায় ভালো দাম পাওয়া যায়। বুঝলাম এবার বৃষ্টি হওয়ার কারণে আগাম জাতের পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে, দামও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত।
কিন্তু পেঁয়াজের বীজে যে পেঁয়াজ হয়; সেটাতো আগাম না। সেই পেঁয়াজেও এবার সর্ব শান্ত হয়েছেন মেহেরপুরের মুজিবনগরের ভবেরপাড়া এলাকার সাইফুল শেখ। ৫৫ বছর বয়সের কৃষক সাইফুল পেঁয়াজে এতটাই লোকসান করে যে আর নিজেকে সহ্য করতে পারেন নাই। তিনি পেঁয়াজের জমিতে গিয়ে বিষ পান করলেন।
মেহেরপুরে যারা গেছেন তারা সবাই স্বীকার করবেন, এই জেলাটি ছোট হলেও আক্ষরিক অর্থে ফসলের জন্য সোনার খনি। আমি যতবার গেছি, এতো সবজি, এতো ফসল যে চোখ জুড়িয়ে যায়। সেই ফসল যারা ফলায় তাদের জীবন কেমন কোনো দিন শহরের মধ্যবিত্ত জানতে চান নাই। এক কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকের নিট খরচ ৩৫ টাকার নিচে না। কিন্তু সরকার ধান কেনে ৩৩ টাকায়। আবার সেই ৩৩ টাকা কিন্তু কৃষক পায় না। প্রথম আলোর গত ১৪ নভেম্বর এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, কৃষক ২০ টাকা কেজিতে বাধ্য হয়েছে ধান বেচতে।
কৃষকের পেঁয়াজ কম দামে কিনছেন ঢাকার বাবুরা, কৃষকের সবজি কমদামে কিনছেন ঢাকার ফেসবুকাররা। তারপর ফেসবুকে এসে সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে বলছেন, কম দামে আলু, পেঁয়াজ, টমেটো কেনায় ধন্যবাদ এ সরকারকে আপনাকে?
ফেসবুকে কি পরিমাণ উজবুকে ভরে গেছে। কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য না দিয়ে , তারে ঠকায় তার শ্রমের ফসল কিনছে আবার সেটা বাহাদুরি হিসেবে দেখাচ্ছে। আচ্ছা কাউকে ঠকানো গর্বের, বাহাদুরির? তাতো বটেই, ঠকানোর মধ্যে জমিদারি ভাব আছে।
বিষপানে আত্মহত্যাকারী সাইফুলের জন্য কেউ কবিতা লিখবে না, কেউ গ্রাফিতিও করবে না, তার জন্য USAID তহবিলও আসবে না। এই সাইফুলরা ব্রিটিশ দস্যুদের দ্বারা ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে জমির ওপর অধিকার, ফসলের ওপর অধিকার সব হারিয়েছে। আমরা এরপর পাকিস্তান বানিয়েছি, তারপর বাংলাদেশ বানিয়েছি, তারপর জুলাই আগস্টে অভ্যুত্থানে নতুন বন্দোবস্ত বানাচ্ছি; কিন্তু কৃষক সাইফুলদের সংকটের সমাধান নেই। কারণ কৃষক এই সব পরিবর্তনের কেউ না, সে গাঁইয়া, সে কৃষক। আর ইহারা ভদ্রলোক।
৩.
শ্রমিকের বকেঢা বেতন না দেয়া ক্রাইম অফেন্স। এই দাবির পক্ষে দাড়ানোর জন্য বামপন্থী হবার দরকার নেই,শুধু মাথাটা ঘাড়ের ওপর যাদের আছে তারাই বলতে পারে।অবশ্য যাদের মাথা পায়ের সাথে ফিট করা তারা দেখবে গার্মেন্টস মালিকদের পা,সেই পা চেটেইতো দিন যায়।মালিকের জুতোয় যদি কোনদিন বিষ মেখে রাখে কেউ তাহলে দেখবেন ফেসবুকের একটা বড় অংশের অ্যাকাউন্ট রিমাবেরিং হয়ে যাবে,বা তারা বিষ পানে মারা যাবে।
মানুষের ওপর হওয়া অপরাধের বিচার চাওয়ার মাথাগুলো পা থেকে কাধের ওপর ওঠুক। এই ঈদ হোক আত্মমর্যাদাবান মানুষ হয়ে উঠার ঈদ। ৮ মার্চ শ্রম ভবনের সামনে শ্রমিকদের বিক্ষোভে দেখা হবে।
আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়,
ও ভাই রে,
ও ভাই, কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।।
আমি যেইদিকেতে চাই
দেখে অবাক বনে যাই।।
আমি অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাই রে।
ও ভাই, অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাই রে।
ভাই রে, ও ভাই রে,
আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।
দেখ, ভালোজনে রইলো ভাঙা ঘরে
মন্দ যে, সে সিংহাসনে চড়ে।।
ও ভাই, সোনার ফসল ফলায় যে তার
দুই বেলা জোটে না আহার।।
হীরার খনির মজুর হয়ে
কানাকড়ি নাই।
ও ভাই, হীরার খনির মজুর হয়ে
কানাকড়ি নাই,
ও তার কানা কড়ি নাই।
ও ভাই রে,
ও ভাই, কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।।
(হীরক রাজার দেশে)

