বিশাল রান্নাঘরে চলছে হাজার হাজার মানুষের রান্নার প্রস্তুতি। ঢাকার ধামরাইতে অবস্থিত স্নোটেক্স গ্রুপে কর্মরত সবাইকে বিনামূল্যে খাবার প্রদান করা হয়। প্রতিদিনই প্রায় ১২ হাজার হাজার কর্মীর দুপুরের খাবার তৈরি করা হয়। মাসে প্রায় কোটি টাকা খরচ হলেও এতে উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পরে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক।
ঢাকার ধামরাইস্থ স্নোটেক্স স্পোর্টসওয়্যার কারখানা সরেজমিন দেখতে গিয়ে কথা হয় গার্মেন্টস সেক্টরের সফল উদ্যোক্তা স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদের সঙ্গে। বেশ বিনয়ী ও সদালাপী এই উদ্যোক্তা তার উঠে আসার গল্প এবং আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ব্যবসা করে শুধু নিজে ভালো থাকা নয়, তার কর্মীরাও যাতে ভালো থাকেন সে চেষ্টাই তিনি সব সময় করেন। এ জন্য তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ১৯ হাজার কর্মী কাজ করেন তাদের সবাইকে নিজ পরিবারের অংশই মনে করেন। এ জন্য তার কারখানায় কাজ করতে কোনো শ্রমিক-কর্মচারীকে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে করে আসা লাগে না। কারণ এই ১৯ হাজার কর্মীর জন্যই তিনি দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন একেবারে বিনামূল্যে। কারখানার নিচ তলায় বিশাল ডাইনিং রুমে বেশ কয়েকটি শিফটে শ্রমিকরা দুপুরের খাবার খান। একেক শিফটে দেড় থেকে ২ হাজার শ্রমিক খাবার খান এখানে। এ ছাড়া সকালের ও বিকালের নাশতার জন্য সুলভ মূল্যের দোকানও খুলে দিয়েছেন তিনি। যেখান থেকে স্বল্পমূল্যে হাল্কা নাশতা সেরে নিতে পারেন শ্রমিকরা।
এই গ্রিন ফ্যাক্টরির পরিকল্পনা কীভাবে এলো? আর কীভাবে তা বাস্তবায়ন করছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে এসএম খালেদ বলেন, প্রথম থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল একটি ভালো কারখানা করব। আমরাও চেষ্টা করছিলাম গ্রিন ফ্যাক্টরি করার। এ জন্য দিনের পর দিন আমাদের এ সংক্রান্ত বিষয়ে স্ট্যাডি করতে হয়েছে। এমনকি আমরা গ্রিনের এক্সপার্ট ভালোভাবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল একটাই, আমরা ভালো কিছু করব। এটি করার কারণ আমরা যদি গ্রিন ফ্যাক্টরি করি তাহলে ইউটিলিটি কস্ট কম লাগবে। আমাদের সবকিছুই ভালো হবে, পরিবেশের ক্ষতিও করব না। এগুলো তো সবই ভালো, তাহলে আমরা কেন করব না? তবে প্রথম দিকে আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। কীভাবে করব? কাকে দিয়ে করব? গ্রিন মানে কী? কিছুই জানতাম না। কিন্তু ভালো কিছু করার ইচ্ছা থেকেই আজ এ পর্যন্ত আসা।
তিনি জানান, আমাদের এ কারখানায় তৈরি পোশাক বিশ্বের নামিদামি অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে রপ্তানি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্নি অ্যাপারেল, অ্যালফাব্রোডার, হ্যাগার ক্লদিং, ভিএফ, কলম্বিয়া স্পোর্টসওয়্যার, কানাডার রিচলু, কানাডা স্পোর্টসওয়্যার, ফ্রান্সের ক্যামাই ইউ, ডিক্যাথলন, ইংল্যান্ডের মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, ডেভেনহ্যামস, বেলজিয়ামের সিঅ্যান্ডএ, স্পেনের ম্যাঙ্গো এবং ডেনমার্কের বেস্টসেলার। এছাড়া শিগগিরই জাপান এবং দুবাইয়ে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির জন্য কাজ শুরু হয়েছে। এখানে নানা ধরনের ক্যাজুয়াল ও ফরমাল পোশাকের পাশাপাশি খেলাধুলার পরিধেয় প্রস্তুত করা হয়। তা ছাড়া সব ধরনের জ্যাকেট তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রতিষ্ঠানটির এখন বার্ষিক টার্নওভার ২৫০ মিলিয়ন ডলার।
তিনি জানান, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করব এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ২০০০ সালে নামেন ব্যবসায়। ‘স্নোটেক্স’ নামে খোলেন একটি বায়িং হাউস। সেই শুরু, আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকদের একজন। গড়ে তুলেছেন চারটি বৃহৎ গার্মেন্টস কারখানা। কর্মসংস্থান করেছেন ১৯ হাজারের অধিক মানুষের। এর পাশাপাশি ‘সারা’ নামের একটি দেশীয় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। যা ইতোমধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
২৩ বছরের ব্যবসায়িক জীবনের পথ চলায় বেশকিছু সম্মানজনক অর্জনও রয়েছে এসএম খালেদের। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ‘স্নোটেক্স আউটারওয়্যার ট্যাক্স কার্ড সম্মাননা পেয়েছে। তৈরি পোশাক শ্রেণিতে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী হিসেবে এই পুরস্কার পায় স্নোটেক্স। ৮ ডিসেম্বর ২০২১ সালে স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেডকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করেছে। ডিএইচএল ও দ্য ডেইলি স্টারের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড-২০১৯’ এ ‘বছরের সেরা ব্যবসায় উদ্যোক্তা’ শ্রেণিতে পুরস্কার পায় ‘স্নোটেক্স’।
সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শন করে দেখা যায়, ধামরাইয়ের ধুলিভিটায় অবস্থিত কারখানা ভবনের একটু দূরেই রয়েছে স্টোর ও বিশাল রান্নাঘর। সেখান থেকে তৈরি হয়ে খাবার পৌঁছে যায় ডাইনিং রুমে। সবার জন্য রয়েছে আলাদা প্লেট। শ্রমিকরা হাত-মুখ ধুয়ে প্লেট নিয়ে সারিবদ্ধভাবে খাবার নেন। শ্রমিকদের বসে খাওয়ার জন্য রয়েছে সারি সারি বেঞ্চ। সে বেঞ্চে আগে থেকেই খাবার সরবরাহকারীরা ভাত, ডাল, সাপ্তাহিক রুটিন মাফিক মাছ, মাংশ, ডিম, ভর্তা, তরকারি, লেবু, কাঁচা মরিচ ও পানি দিয়ে থাকেন। শ্রমিকরা হাত-মুখ ধুয়ে প্লেট নিয়ে এলেই তারা তুলে দিচ্ছেন প্লেটে। ছুটির দিন ব্যতীত প্রত্যেক কর্ম দিবসেই এভাবে শ্রমিকদের দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। এখানে ডাল-ভাত যে যত খেতে পারেন-কোনো বাধা নেই। শ্রমিকরা বেশ তৃপ্তি সহকারেই দুপুরের আহার সারেন। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও দুপুরের খাবার এখানেই সেরে নেন। ২০১৫ সাল থেকে কারখানাটি খোলা থাকলে প্রতিদিনই চলছে দুপুরের খাবার।
কারখানায় কর্মরত বেশ কয়েকজন শ্রমিক জানান, অন্য কারখানার মতো এই কারখানায় তাদের টিফিন ক্যারিয়ার বহন করতে হয় না। দুপুরে রান্নার জন্য নারী শ্রমিকদের বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয় না। বাসা থেকে আনা খাবার নষ্ট হয়ে গেল কি না, তাও চিন্তা করতে হয় না। দুপুরে হেঁটে বাসায় গিয়ে খাবার খাওয়া বা বাড়তি দাম দিয়ে দোকান থেকে খাবার কিনে খেতে হয় না। এক বেলা খাবারের টাকাটা সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি গরম ও স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাচ্ছেন বলে শ্রমিকরা অসুস্থও হন কম। রান্নার জন্য নিয়োজিত জনবলের বেতন, সিলিন্ডার গ্যাসের খরচসহ কারখানা মালিকের মাসে খরচ হয় প্রায় কোটি টাকা। আবার এখানে শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে মেডিকেল সেন্টার। সেখানে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় টেস্ট এবং ওষুধপত্রও রয়েছে। এখানে শ্রমিক-কর্মচারিদের ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ করা হয়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শ্রমিকদের বিনোদনের ব্যবস্থা হচ্ছে। এসব সুবিধার বাইরেও কারখানাটি তার মুনাফার একটি অংশ শ্রমিকদের দিয়ে থাকে।
কারখানা পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, প্রথম ভবনের সামনে রয়েছে সবুজে ঘেরা বাগান। অপর পাশে সবজি বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। শ্রমিকদের অবসর সময় কাটাতে রয়েছে সবুজ মাঠ। কারখানাটির চারদিকে সবুজের খেলা। প্রতিষ্ঠানটির সব কারখানায় ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কারখানাগুলোর ছাদে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে স্নোটেক্সের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১২ শতাংশ পূরণ করা হয়। পাশাপাশি সরকারি ছুটির দিনগুলোতে অব্যবহৃত বিদ্যুৎ জাতীয় পাওয়ার গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও কারখানাটিতে রয়েছে জাপানি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট।

