সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাসটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সময় ধরে স্বৈরশাসন করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এ দেশের শ্রমিক-ছাত্র-জনতা। দীর্ঘ ১৬ বছরের গণতন্ত্রহীনতা, লুটপাট আর অপশাসনের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে রাস্তায় নেমে আসে সর্বস্তরের মানুষ। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে জুলাই মাস গড়িয়ে আগস্ট চলে আসে আর সেই মাসের পঞ্চম দিবসে দেশ ছেড়ে পালান হাসিনা, পতন ঘটে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের। আরও একবার ঐক্যবদ্ধ জনতার জয় হয়।
তবে পঞ্জিকায় মাসের পাতা উল্টালেও আন্দোলনকারীরা তা মানতে রাজি হননি। তারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত জুলাই মাস চলবে বলে ঘোষণা দেন, আর তাই ৩১, ৩২ করে চলে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত। জুলাই হয়ে উঠে সংগ্রামের অপর নাম। এই সংগ্রামে সবচেয়ে মরিয়া অংশ ছিল মেহনতি মানুষ। শিক্ষিত মানুষের মতো তাদের মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেই, নিজেদের কৃতিত্বের কথা ফলাও করে প্রচার বা এর থেকে নানারকম সুবিধা নেওয়ার কৌশল তাদের জানা নেই। অথচ তারা সর্বস্ব ত্যাগ করতে পারে, বিসর্জন দিতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ-জীবন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বাহিনীকে ঠেকাতে লেনিনগ্রাদে অকাতরে জীবন দিয়েছিল মেহনতি মানুষ। দানবীয় মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে মানবঢাল হয়ে বাঁচিয়েছিল বিশ্বসভ্যতাকে। ঠিক একই রকম লেনিনগ্রাদ হয়ে উঠেছিল শ্রমিকঘন অঞ্চল যাত্রাবাড়ী, ঢাকার পোশাক শ্রমিকদের অন্যতম এলাকা আশুলিয়া। বাংলাদেশকে আরও একবার রক্ষা করলেন এই মেহনতি মানুষেরা। জুলাই শেষে অনেকের জীবনে আগস্ট এলো, এমনকি ক্ষমতার ফুল ফোটা শুরু করল বসন্ত আসার অনেক আগেই। নানারকম ভাগবাটোয়ারা আর বন্দোবস্ত চলতে লাগল, ফুটল কথার ফুলঝুরি। কিন্তু শ্রমিকদের জুলাই যেন শেষ হলো না।
নতুন স্বপ্ন দেখা দূরের কথা, নিজেদের ন্যূনতম পাওনা পর্যন্ত চাইতে গিয়ে তাদের মার খেতে হচ্ছে, যেমনট হতো হাসিনাশাহীর সময়। মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করতে বাধ্য হন। আন্দোলনে আসা অভুক্ত, উদ্বিগ্ন শ্রমিক মারা যান হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। আর দাবিদাওয়াকারীদের জন্য নেমে আসে পুলিশের লাঠির বাড়ি। বাংলাদেশের এক বিখ্যাত সাহিত্যিক স্বাধীনতা বিষয়ে একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, আমরা আগে পাঞ্জাবিদের লাথি খেতাম, এখন জাতভাইদের লাথি খাব। ঈশপের গল্পে গাধার যেমন ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না, তেমনি এই শ্রমিকদেরও হয় না। যেই পুলিশ কিনা মাজার ভাঙা ঠেকাতে পারে না, মব নামের বিশৃঙ্খলার সামনে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকে, তারা ভয়াবহ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন রোগাপাতলা, নিরস্ত্র শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। যেই সরকার পতিত, খুনি, লুটেরা আওয়ামী লীগের বিচার করতে পারে না, জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়াদের প্রাপ্য সম্মান ও সহায়তা দিতে পারে না, সেই সময় যাদের দুর্বল, অক্ষম মনে হয়, শ্রমিক পেটানোর বেলায় যেন তারা রীতিমতো কলকাতা হারবালপুষ্ট মরদ।
‘জনৈক কার্ল মার্ক্স’ বলতেন, শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা মেরে দিয়ে, সারপ্লাসের ওপর গড়ে উঠে পুঁজিবাদী ভোগবিলাস। ফলত, শ্রমিকের প্রাপ্য না দেওয়ার ব্যাপারে পুঁজিবাদী সমাজে সব শক্তিই এককাট্টা। উৎপাদনযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত না থাকা ‘মব উসকে’ দেওয়ারা মূলত এই পুঁজিবাদের উচ্ছিষ্টভোগী, ফলে তারা বায়বীয় চেতনায় বুঁদ রাখতে চায়। সে আলাপ বাদই দিলাম, একেবারে পুঁজিবাদী যুক্তিতেই ভাবি। পুঁজিবাদীরা দাবি করেন, যেহেতু তারা কারখানা গড়তে, ব্যবসা করতে ‘ঝুঁকি’ নেন, ফলত ব্যবসার লাভের সিংহভাগ তাদের প্রাপ্য। উপযোগ যে মূলত শ্রমের ফলেই উৎপাদিত হয় এই সরল-সত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা ‘ঝুঁকি’ নেওয়াকেই সবচেয়ে জরুরি ভাবেন। আচ্ছা, আমরা সেইটা মানলাম। সেই যুক্তিতেই শ্রমিক লাভের অতি সামান্য অংশই বেতন হিসেবে পান। তাহলে যেটা দাঁড়ায় যে, যেই মানুষটি বেতন বা মজুরিতে কাজে রাজি হইলেন কারণ তাকে আর কোনো ‘ঝুঁকি’ নিতে হবে না। তিনি তার যতসামান্য বেতন মাস গড়ালেই পেয়ে যাবেন। ব্যবসায় লাভ হলো না লোকসান তার দায় তাকে দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
কিন্তু মালিকপক্ষ তথা পুঁজিপতি এই ব্যাপারটাও মানতে রাজি না। তারা তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখিয়ে ইতিমধ্যেই হিস্যা হারানো, শক্তি না থাকা শ্রমিকদের এই ন্যায্যটুকুও দিতে গড়িমসি করেন। এখানে চলে আসে সরকারের ভূমিকা। নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের শপথের ওপর সরকারের বৈধতা দাঁড়ানো। মালিক বা শ্রমিক যেই হোক, সে যদি ন্যায্যতা বজায় না রাখতে পারে তবে সরকার ও আইন সেখানে হস্তক্ষেপ করবে। বাধ্য করবে তা নিশ্চিত করতে। শ্রমিক যদি একেবারে ন্যূনতম ন্যায্যতা তথা তার মজুরি সময়মতো না পায় তবে সরকারের কাছে দায়িত্বই শুধু অর্পিত হয় তাই না, বরং তা না করতে পারলে তার বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। যেই সরকারের ম্যান্ডেট হচ্ছে জুলাইয়ের আন্দোলন, শ্রমিক-মেহনতি মানুষের রক্ত, তাদের জন্য তা আরও অনেক বেশি জরুরি। এই আলোচনায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে একটি শঙ্কার কথা উঠে আসছে। পতিত শক্তি গত দেড় দশকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুট করেছে, দেশ ও বিদেশে তাদের রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চিত হয়েছে, যা দিয়ে বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব। এই সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়, তবে দিন শেষে, সেই দায়িত্বও সরকারেরই। মাজার ভাঙার সময় নির্বাক দর্শক হয়ে থাকা আর শ্রমিক ঘেরাওয়ে অগ্রাসী হওয়াটা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য না।
শ্রমিকের জুলাই শেষ না হলে, বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন শেষ হয়েছে বলে ধরা যাবে না।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

